১৮ মাসে ‘ইউনুস ম্যাজিক’ ও শিল্পকারখানার সংকট
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি শিল্পখাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প। এই খাতই দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ যোগান দেয় এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। কিন্তু গত প্রায় দেড় বছরে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তন, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাবে দেশের শিল্পখাতে এক ধরনের নীরব সংকট তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন তথ্য ও প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সময়ে ৩০০ থেকে ৪০০-এর বেশি ছোট-বড় শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ফলে লক্ষাধিক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন এবং শিল্পাঞ্চলগুলোতে এক ধরনের অর্থনৈতিক স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে সংকটটি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)-এর তথ্যমতে, গত এক বছরে প্রায় ৩০০-এর বেশি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে বা মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে গত এক বছরে ১৮৫টি থেকে ৩৫০টির বেশি কারখানা বন্ধ হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। শিল্পাঞ্চল গাজীপুরেই প্রায় ১২৮টি ছোট-বড় কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানা যায়।
এই বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে বেক্সিমকোর ১৩টি প্রতিষ্ঠানসহ শ্রীপুরের ডার্ড কম্পোজিট, টঙ্গীর খাঁপাড়া এলাকার সিজন ড্রেসেস, কোনাবাড়ীর পলিকন লিমিটেড, টেক্সটিল ফ্যাশন, স্ট্যান্ডার্ড সিরামিক, ক্লাসিক ফ্যাশন, লা-মুনি অ্যাপারেলস, নাসা গ্রুপের লিজ ফ্যাশন, স্বাধীন গার্মেন্টস এবং মিককিফ অ্যাপারেলসের মতো বহু পরিচিত প্রতিষ্ঠান।
শুধু গাজীপুর নয়, চট্টগ্রামেও গত ছয় মাসে অন্তত ৫২টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এদের অনেকগুলোর মালিকানা রাজনৈতিক প্রভাব বা আর্থিক ঝুঁকির সাথে সম্পৃক্ত ছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।
অন্যদিকে শিল্পাঞ্চল সাভার ও আশুলিয়াতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। এখানে অন্তত ১৩৯টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে—কিছু স্থায়ীভাবে, কিছু অস্থায়ীভাবে। স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়া কারখানার মধ্যে রয়েছে জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশন লিমিটেড, দ্য ড্রেসেস অ্যান্ড দ্য আইডিয়াস লিমিটেড, বসুন্ধরা গার্মেন্টস লিমিটেড, ছেইন অ্যাপারেলস লিমিটেড, নাসা গ্রুপ, সাউথ চায়না গ্রুপ ও ইথিক্যাল গার্মেন্টস লিমিটেড। আর অস্থায়ীভাবে বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে সিঙ্গার রেফ্রিজারেটর লিমিটেড, সিঙ্গার ইলেকট্রনিকস, এফআরএম ফ্যাশন হাউস লিমিটেড, হিলটন অ্যাপারেলস লিমিটেড, জেইসা ফ্যাশন লিমিটেড, ফ্রাউলিন ফ্যাশন লিমিটেডসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান।
কারখানা বন্ধ হওয়ার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজ করছে। প্রথমত, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার শিল্প উদ্যোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। দ্বিতীয়ত, কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) সংকটের কারণে উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। তৃতীয়ত, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিক অসন্তোষ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বাজারের অনিশ্চয়তা।
এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে। চাকরি হারিয়ে অনেক শ্রমিক ঘরভাড়া, দোকান বাকি কিংবা পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে নিজ গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ পেশা পরিবর্তন করছেন। শিল্পাঞ্চলগুলোর আশপাশে যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হয়েছিল—দোকানপাট, বাসা ভাড়া, পরিবহন—সেগুলোও এখন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
শিল্পখাতের এই সংকট দীর্ঘমেয়াদে দেশের রপ্তানি আয় ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সরকারকে শিল্পবান্ধব নীতি গ্রহণ, ব্যাংক ঋণের সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে আনা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল করা এবং কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে এলসি সংকট দূর করার জন্য দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ নিশ্চিত করা এবং শিল্পাঞ্চলে স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের অর্থনীতির শক্ত ভিত্তি হিসেবে শিল্পখাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে সংকটের মূল কারণগুলো দ্রুত সমাধান করা ছাড়া বিকল্প নেই। অন্যথায়, শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার এই ধারা যদি অব্যাহত থাকে, তবে তা শুধু শ্রমিকদের জীবনেই নয়, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতেও বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে।

