ভোটের লড়াই,,কিন্তু সম্পর্কের যুদ্ধ নয়।
আজকের দিন পেরিয়ে আগামীকালই বাংলাদেশের মানুষের বহুল কাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে উত্তেজনা, আশা-আকাঙ্ক্ষা, ভয় ও প্রত্যাশা—সবকিছু একসাথে কাজ করছে। দীর্ঘ সময় ধরে মানুষ অপেক্ষা করেছে এই দিনের জন্য। কিন্তু এই প্রতীক্ষার মাঝেই একটি বিষয় আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেওয়া জরুরি—নির্বাচন আসবে, যাবে; ফলাফল যা হওয়ার তা হবেই। এই বাস্তব সত্যের বাইরে গিয়ে যদি আমরা ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সামাজিক সৌহার্দ্য কিংবা পারস্পরিক সম্মান নষ্ট করি, তাহলে সেই ক্ষতির দায়ভার আমাদেরই বহন করতে হবে।
বাংলাদেশের সমাজ কাঠামো মূলত পারিবারিক ও প্রতিবেশী সম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। গ্রাম হোক বা শহর—পাশের মানুষটাই বিপদে-আপদে আগে এগিয়ে আসে। অথচ নির্বাচন এলেই দেখা যায়, মতাদর্শের ভিন্নতার কারণে প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বন্ধ, পারিবারিক টানাপোড়েন, এমনকি মারামারি পর্যন্ত ঘটে। প্রশ্ন হলো—একটি পাঁচ বছরের রাজনৈতিক মেয়াদের জন্য কি আজীবনের সম্পর্ক ভেঙে ফেলা যুক্তিসংগত?
নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারিত হয় ব্যালটের মাধ্যমে, কোনো ব্যক্তিগত তর্ক বা সামাজিক দ্বন্দ্বের মাধ্যমে নয়। আপনি কাকে ভোট দেবেন, সেটি আপনার সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু আপনার ভোটের কারণে আপনার প্রতিবেশী শত্রু হয়ে যাবে—এমন কোনো শর্ত সংবিধান দেয়নি। বরং গণতন্ত্র শেখায় ভিন্নমতকে সম্মান করতে। যুক্তি দিয়ে কথা বলা, সহনশীল থাকা এবং মতভেদ থাকা সত্ত্বেও সহাবস্থান করাই গণতান্ত্রিক চর্চার মূল শিক্ষা।
বাস্তব উদাহরণ আমাদের চারপাশেই আছে। আগের অনেক নির্বাচনে দেখা গেছে, নির্বাচনের দিন উত্তেজনায় মানুষ প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝগড়ায় জড়িয়েছে, পরে ফলাফল ঘোষণার পর বুঝেছে—যাকে সমর্থন করেছিল, সে জিতুক বা হারুক, ব্যক্তিগত জীবনে তাতে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। কিন্তু যে সম্পর্কগুলো নষ্ট হয়েছে, সেগুলো আর সহজে জোড়া লাগেনি। একজন প্রতিবেশী, যিনি আগে সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়াতেন, তিনি আর আগের মতো থাকেননি।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আপনার সুখ-দুঃখে রাজনীতিবিদ নয়, আপনার আশপাশের মানুষই আগে এগিয়ে আসে। অসুস্থ হলে হাসপাতালে নিয়ে যায়, বিপদে সাহায্য করে, আনন্দের মুহূর্তে ভাগ বসায়। নির্বাচনের পর জয়ী প্রার্থী হয়তো এলাকা ছাড়িয়ে জাতীয় রাজনীতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন, কিন্তু আপনার প্রতিবেশী ঠিকই আপনার পাশের বাড়িতেই থাকবেন। এই বাস্তবতা ভুলে গেলে চলবে না।
নির্বাচন একটি প্রক্রিয়া, জীবন নয়। রাষ্ট্র চলবে নিয়মে, সরকার আসবে-যাবে। কিন্তু সমাজ যদি ভেঙে পড়ে, পারস্পরিক বিশ্বাস যদি নষ্ট হয়, তাহলে রাষ্ট্রের কাঠামোও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই এই নির্বাচনের প্রাক্কালে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব আমাদের নিজেদের—উত্তেজনা সংযত রাখা, ভিন্নমতকে সম্মান করা এবং সামাজিক বন্ধন অটুট রাখা।
সবশেষে বলা যায়, নির্বাচন নিয়ে সচেতন হোন, ভোটাধিকার প্রয়োগ করুন, মত প্রকাশ করুন—কিন্তু তা যেন ঘৃণা, বিদ্বেষ বা সংঘাতে রূপ না নেয়। কারণ নির্বাচন আগেও এসেছে, আগামীতেও আসবে। কিন্তু আপনার পাশে থাকা মানুষগুলো—প্রতিবেশী, আত্মীয়, বন্ধু—তাদের গুরুত্ব নির্বাচনের ফলাফলের চেয়েও অনেক বেশি।
লেখক : কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
প্রকাশক ও সম্পাদক, GNN TV 24

