বিজয়ের পর দায়িত্বের কঠিন পথচলা ও গণতন্ত্রের পরীক্ষা
আব্দুল্লাহ আল মামুন
বিজয় কখনোই চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; বরং সেটিই নতুন দায়িত্ব ও কঠিন পরীক্ষার সূচনা।
একটি রাজনৈতিক দলের জন্য নির্বাচনী সাফল্য যেমন জনসমর্থনের স্বীকৃতি, তেমনি তা প্রত্যাশার ভারও বহন করে।
কারণ ক্ষমতা অর্জনের পরই শুরু হয় প্রকৃত মূল্যায়ন—সিদ্ধান্ত, সক্ষমতা ও সততার।
বিজয়ী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সমর্থকেরা উচ্ছ্বসিত—এটাই স্বাভাবিক।
তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা বলছে, উচ্ছ্বাস দ্রুতই দায়িত্বের চাপে রূপ নেয়।
প্রকৃত বিজয় তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা সুশাসন, ন্যায়বিচার ও জনগণের আস্থায় প্রতিফলিত হয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস শিক্ষা দেয়—বিজয় ও পতন একে অপরের পরিপূরক।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে; কিন্তু স্বাধীনতার চেতনা রক্ষা করা আরও কঠিন দায়িত্বে পরিণত হয়।
রাষ্ট্র পরিচালনায় বিচ্যুতি বা একচ্ছত্রতার প্রবণতা যে কোনো দলকেই জনআস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে।
ইতিহাস তাই ক্ষমতাসীনদের জন্য সতর্কবার্তা।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির সংস্কৃতি গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন।
তাঁর উত্তরসূরি খালেদা জিয়া ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।
তাঁদের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে—ক্ষমতার স্থায়িত্ব নির্ভর করে প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়ার শক্তির ওপর, ব্যক্তির ওপর নয়।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান -এর সামনে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এসবই তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার।
জনগণ এখন প্রতিশ্রুতি নয়, ফলাফল দেখতে চায়।
ঘোষিত অঙ্গীকারসমূহ বাস্তবায়নে ব্যর্থতা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
পররাষ্ট্রনীতিতেও ভারসাম্য অপরিহার্য।
ইন্ডিয়া ও পাকিস্তান -এর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ইউনাইটেড স্টেটস ও চায়না -এর সঙ্গেও কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।
আবেগ নয়, রাষ্ট্রের স্বার্থই এখানে প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিত।
গণতন্ত্র কেবল ক্ষমতাসীনদের দ্বারা পরিচালিত হয় না; এটি টিকে থাকে শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল বিরোধী দলের মাধ্যমে।
একটি কার্যকর বিরোধী দল সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তের সমালোচনা করবে—কিন্তু তা হবে গঠনমূলক ও তথ্যনির্ভর।
সংসদকে অকার্যকর করা, অকারণ বয়কট কিংবা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি গণতন্ত্রকে দুর্বল করে; আবার সরকারের ভুলের সামনে নীরব থাকাও সমান ক্ষতিকর।
বিরোধী দলের কাজ তিনটি স্তরে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, জবাবদিহি নিশ্চিত করা। বাজেট, নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক চুক্তি নিয়ে সংসদে বিশ্লেষণাত্মক বিতর্কের মাধ্যমে তারা সরকারের সিদ্ধান্তকে পর্যালোচনা করবে।
দ্বিতীয়ত, বিকল্প নীতি প্রস্তাব করা। শুধু সমালোচনা নয়, কার্যকর বিকল্প তুলে ধরাই একটি পরিণত রাজনৈতিক শক্তির লক্ষণ।
তৃতীয়ত, জনগণের কণ্ঠস্বর তুলে ধরা। প্রান্তিক অঞ্চল, বঞ্চিত জনগোষ্ঠী ও বিরোধী মতের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করাই বিরোধী দলের নৈতিক দায়িত্ব।
বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, যখন বিরোধী দল দুর্বল বা বিভক্ত থাকে, তখন ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হয়।
আবার যখন বিরোধী দল কেবল আন্দোলনমুখী হয়ে সংসদীয় প্রক্রিয়া এড়িয়ে চলে, তখন নীতিনির্ধারণে জনগণের অংশগ্রহণ কমে যায়।
সুতরাং বিরোধী দলের সামনে এখন সুযোগ—দায়িত্বশীল রাজনীতির নতুন মানদণ্ড স্থাপন করা।
নতুন মন্ত্রিসভায় নবীনদের উপস্থিতি যেমন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়, তেমনি অভিজ্ঞতার ঘাটতি নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এর -এর মতো অভিজ্ঞ নেতাদের পাশাপাশি আরও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট।
ইতিহাসে হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদ কিংবা জিয়াউর রহমান তাঁদের সময়ে যোগ্য ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।
অন্যদিকে দীর্ঘ শাসনামলে শেখ হাসিনা -এর আমলে নেতৃত্ব বিকাশের পরিবেশ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে—যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে নতুন করে ভাবনার দাবি রাখে।
সবশেষে বলা যায়, সাফল্য কোনো প্রতিযোগিতা নয়—এটি একটি দীর্ঘ যাত্রা।
প্রতিদিনের ছোট ছোট সঠিক সিদ্ধান্তই বড় পরিবর্তনের ভিত্তি গড়ে তোলে।
নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ যেমন বড়, তেমনি সম্ভাবনাও বিস্তৃত।
ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও সৎ উদ্দেশ্য থাকলে কঠিন পরীক্ষাও উত্তীর্ণ হওয়া সম্ভব।
বিজয় তাই কোনো সমাপ্তি নয়; এটি বৃহত্তর দায়িত্বের সূচনা।
সরকার যদি দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে এবং বিরোধী দল যদি গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে—তবেই জাতি একটি স্থিতিশীল ও উন্নত ভবিষ্যতের দিকে এগোতে পারবে।
ইতিহাসের কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য এখন প্রয়োজন পরিণত রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সমষ্টিগত প্রজ্ঞা।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও সাংবাদিক।

